• শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩:৫৭ অপরাহ্ন
  • English Version

কক্সবাজার বইমেলা অনন্য সাহসের প্রতিচ্ছবি ।

রিপোর্টার
আপডেট : রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

বদরুল ইসলাম বাদলঃ মেলা ।সব শ্রেণীর মানুষের একটি মিলন ক্ষেত্র ।ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষের মাঝে মেলা উৎসবের আমেজে বহমান জীবনে গতিশীল প্রাণের সন্চালন।মনের দক্কিনা দুয়ার খুলে ক্লান্ত জীবনে বসন্তের সমীরণ।আর সেই মেলা টি যদি বই মেলা হয়।তখন উল্লাস উদ্দিপনার আমেজটি আরও বেশি থাকে ।মেলায় থাকে লেখকদের সৃষ্টি সুখের উল্লাস ।পাঠকের প্রিয় লেখকের প্রিয় বইটি সংগ্রহের নিদারুণ তৃপ্তি ।প্রিয় লেখককে কাছ থেকে দেখার কিংবা আড্ডা দেওয়ার মতো একটি স্থান ।অটোগ্রাফ নেয়া এবং ছবি তোলা।আর হরেক রকমের বইয়ের সাথে নিজের জীবনকে রোমান্টিক রোমাঞ্চিত করে যেন হারিয়ে যেতে নেই মানা।

“বই ছাড়া একটি কক্ষ,আত্মা ছাড়া দেহের মত”এই শ্লোগানকে ধারণ করে শহীদ দৌলত ময়দানে কক্সবাজার জেলায় একুশের বই মেলা হয়ে গেল ।করোনা পরিস্থিতির কারণে দেরিতে হলে ও ফেব্রুয়ারির আটাশ তারিখ থেকে একুশের বইমেলা শুরু হয় । উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ভাষার মাসে প্রতিবছর বইমেলা হয়ে আসছে। কিন্তু মহামারীর কারণে অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝে ও সফলতার সাথে 28 ফেব্রুয়ারি থেকে 07,মার্চ 21পর্যন্ত চলে কক্সবাজার বই মেলা ।
কক্সবাজার বই মেলা টি যেন সাহসের প্রতিকৃত ।চেতনার উজ্জ্বল উজ্জীবিত প্রদীপ শিখা।হার না মানা লড়াকু বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির দৃশ্যমান সাক্ষ্য ।কারণ কোভিড 19 মহামারীর ভয়াবহতায় পৃথিবী থমকে দাড়ায়।বাঁচার জন্য মানুষের সংগ্রাম করতে করতে হয়রান। হতাশা ও অবসাদ নেমে আসে জীননে।মহামারীর প্রকোপ নিন্মঘরে আসলে অবচেতন আলস্য জগত থেকে মানুষকে বের করে মেধার জগতের দুয়ার খুলে দিয়ে এগিয়ে আসে কক্সবাজার বইমেলার আয়োজক কমিটি।দুর্গম গিরি পথে চেতনা ও শক্তির ছোঁয়া খুঁজে পায় মানুষ। মনন জগতে বইমেলা টি হয়ে উঠে চৈত্রের কাঠফাটা রোদে এক পসরা বৃষ্টি হয়ে সিক্ত করা ।তাই মনে হয় জার্মান ভাষার উপন্যাস লেখক ফ্রাঞ্জ কাফকা যথার্থ বলেছিলেন “আমাদের আত্মার মাঝে যে জমাট বাধা সমুদ্র সেই সমুদ্রের বরফ ভাঙ্গার কুঠার হল বই” ।অন্যদিকে ফরাসী দার্শনিক দেকার্তের ভাষায় “একটি ভাল বই পড়া মানে গত শতাব্দীর ভাল মানুষদের সাথে কথা বলা।”
“আজি হতে শত বর্ষ পরে হে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতা খানি”। 1302 বাংলা বর্ষে বসে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিখ্যাত 1400 সাল কবিতা খানি
রচনা করেছিলেব।সেই দিনের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সাথে মনের আকুতি আবেগ মিশিয়ে রচনা করেন কবিতাটি।রবীন্দ্রনাথ জানতেন তিনি শত বছর পর দুনিয়াতে থাকবেন না।কিন্তু শত বছরের পরের প্রজন্মকে তার ভালবাসার কথা জানিয়ে কবিতা লিখে গিয়ে একটি মিলনের বন্ধনে আবদ্ধ করে গেছেন ।আর আগেকার সেই লিপিবদ্ধ সংকলন থেকে 1427 বাংলা বর্ষে এসে আমরা কবিতাটির সাথে পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছি।যা এক মাত্র বইয়ের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে।
সক্রেটিস খ্রিস্টপূর্ব 470 বছর আগেকার একজন দার্শনিক। তাকে পশ্চিমী দর্শনের ভিত্তি স্থাপনকারী হিসেবে দেখা হয়।সমাজ, রাষ্ট্র ,শাসন ব্যবস্থা এবং নৈতিকতা নিয়ে তার বিখ্যাত শিষ্য এরিষ্টোটলের বই “পলিটিক্স” আধুনিক সভ্যতার মাঝেও আধিপত্য নিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে ।ন্যায়বিত্তিক আদর্শ রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে সক্রেটিসের আর এক শিষ্য প্লেটোর বই “রিপাবলিক ” জগত সেরা বই। মানুষ রাষ্ট্রে বসবাসের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে,কেউ কারও উপর হস্তক্ষেপ করবে না ।সার্বজনীন শ্রম,সমান অধিকার,শ্রেণীহীন সমাজ সাম্যবাদের ধারণা রিপাবলিক বইতে খুঁজে পাওয়া যায় ।আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা প্লেটোর দেয়া দুই হাজার পাঁচ শত বছরের আগে সাম্যবাদের ধারণাকে যুগোপযোগী করে ব্যাখ্যা করছেন। বিশ্বের প্রায় সব ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মাঝে এই বই পাঠ্যবই এবং গবেষণা করা হয়ে আসছে । সভ্যতার বিকাশের ধাপে ধাপে সব ঐতিহাসিক পটভূমি কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্য এবং কৃষি শিল্প বিজ্ঞান সর্বোপরি চিন্তাচেতনার পরিচিতি গুলো বইয়ের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়।বইই সভ্যতার সাথে সভ্যতার ।দেশের সাথে দেশের সেতু বন্ধন হিসেবে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ”
কে জানিত মানুষ অতীতকে বর্তমানে বন্দি করিবে?অতল স্পর্শ কাল সমুদ্রের উপর কেবল এক একখানি বই সাঁকো বাঁধিয়া দিবে।”
আলোকিত মানুষের যাপিত জীবন যেন সাবলীল সুন্দর জীবন গড়ার দর্পণ ।সৃষ্টিশীল রশ্মি।একটি জীবন মুখী পাঠশালা । আমেরিকান কবি জেমস্ রাসেল বলেন “বই হল এমন এক মৌমাছি যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে।”
তাই একটি বই মানুষের জ্ঞানের পরিধি অনেক বিস্তৃত করতে পারে ।আলোকিত মানুষের হাত ধরেই আলোকিত মানুষ হওয়া যায় ।আর আলোকিত মানুষের ম্যাজিক হল বই এবং বই পড়া।আর বই নির্বাচনের উপযুক্ত উন্মুক্ত জায়গা হল বই মেলা।।যে মেলা আজ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ।বই মেলা সব শ্রেণীর মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টি করতে পারে । এক জায়গায় বিভিন্ন জ্ঞানঅন্নেসনী মানুষের মিলন মেলা হল বই মেলা।
দেশের আনাচে কানাচে সব সময় কোন না কোন মেলা হয়ে থাকে ।কিন্তু বই মেলার মতো জাগরণ কোন মেলা সৃষ্টি করতে পারে না।সে নিরিখে কক্সবাজারের বই মেলা টি কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে।করোনা মহামারী জয়ের সাথে একটি অনন্য প্রতিকৃত কক্সবাজারের বই মেলা।জানা মতেএকুশ সালে কক্সবাজারের বই মেলা টি বাংলাদেশের প্রথম বই মেলা ।ভাষার মাসের কক্সবাজারের মেলা টি তাই অন্যতম গৌরবের দাবিদার।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আযাদ সাহেবের শুভ সূচনার মাধ্যমে আলো জ্বলে উঠেছিল কক্সবাজারের বই মেলার ।আর সে আলোর মিছিলে রংধনু রুপে হাজির হয়ে পরিপুর্নতার সাক্ষর রাখেন প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক সেলিমা হোসেন ।সাগর পাড়ের মানুষের চেতনায় সাহস যোগানোর জন্য আলোকিত করেছিলেন তিনি বই মেলার কথামালার মন্চ।আর বই মেলার আলোর বাতি টি সপ্তাহব্যাপী স্বযত্নে্ ধরে রেখেছিল কক্সবাজার জেলার মাননীয় জেলা প্রশাসক জনাব মামুনুর রশিদ সাহেব
জেলা প্রশাসন কতৃক আয়োজিত সপ্তাহলা প্রপীশাসন কতৃক আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী বইমেলায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ।নতুন বইয়ের মোড়ক খোলা । কবিতা আবৃত্তি ।নাচ ।গান আর কথামালা ।সফল সার্থক মেলাটি সফলতার পিছনে কথামালার কথায় বারবার উঠে আসে কক্সবাজার জেলার মাননীয় এডিসি রেভিনিউ জনাব আমিন আল পারভেজ সাহেবের ঐকান্তিক আন্তরিকতার কথা। কক্সবাজার বইমেলা 21 আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব নাট্যজন এডভোকেট তাপস রক্ষিত জানান” বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ প্রকাশনী সংস্থা গুলো অংশ নিয়েছে বইমেলায়।এবার ঢাকা এবং চট্টগ্রাম থেকে এসেছে 50 টি স্টল ।আর কক্সবাজারের স্থানীয় পর্যায়ের তিনটি স্টল ।কক্সবাজার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন বটবৃক্ক এডভোকেট তাপস রক্ষিত ।যার নিরলস প্রচেষ্টার ফল এই সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রেমীদের জন্য বইমেলাটি হয়ে উঠেছিল মিলন মেলা হিসেবে।
কক্সবাজারের বইমেলা নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে আরও একটি বইমেলার কথা উঠে আসে।কারণ বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে সীমান্ত জেলা পর্যটন শহরের জন্য এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াস।শুধু তাই নয় যতদূর মনে হয় পুরো বাংলাদেশের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্দ্যেগ ।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে 27 ও 28 সেপ্টম্বর 2020 দুদিনব্যাপী বইমেলা ।তিনি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক ,দেশের এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।আবার তিনি লেখক এবং চিন্তাবিদ ।ওনার লিখিত অনেক গুলো বই প্রকাশিত হয়েছে ।উন্নয়ন,সমৃদ্ধি কর্মসূচি নির্ভর বই ।রাজনীতি অর্থনীতি নিয়ে স্মৃতিচারণ সহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি তার সৃষ্টিশীল যোগ্যতার দৃষ্টান্তমূলক স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন ।আর শেখ হাসিনা লিখিত বই গুলো নিয়ে তার জন্মদিনের ঐতিহাসিকতা সমুজ্জ্বল করতে কক্সবাজারের পাবলিক হলে হয়ে গেল দুই দিনের বইমেলা ।যার আয়োজক ছিলেন কবি মানিক বৈরাগী ।কবি মানিক বৈরাগী একজন সাবেক ছাত্র নেতা ,রাজনৈতিক গবেষক , প্রাবন্ধিক এবং গল্প লেখক।স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অত্যাচারিত কারানির্যাতিত নেতা ।শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হাতে ।যার ভার এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন।ওয়াকিং স্টিক ছাড়া স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারেন না।আপোসহীন বঙ্গবন্ধু প্রেমী কবি মানিক বৈরাগী অসুস্থ শরীরে এখনও বঙ্গবন্ধু চর্চা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন ।যার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরিকল্পনায় শেখ হাসিনার জন্মদিন ঘিরে শুধু শেখ হাসিনার লিখিত বই নিয়ে দুই দিনের বইমেলা আয়োজন করেন ।উৎসব মুখর পরিবেশে বইমেলা টি সত্যি কক্সবাজারের তথা দেশের বইমেলা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে ।আর সফল বইমেলার স্বর্বাত্বক সহযোগিতা করেছেন কক্সবাজারে প্রগতিশীল ধারার প্রিয় পরিচিত মুখ তাপস রক্ষিত ।
স্বাধীনতার সুবর্ণ রজতজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বই এবং বইমেলা একটি আন্দোলনের অপর নাম হতে পারে ।কারণ স্বাধীনতা বিরোধী এবং প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ইতিহাস বিকৃতি করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে।হাজার বছরের বাঙালি জাতির কৃষ্টি সংস্কৃতি আজ ক্ষত বিক্ষত ।অনেকে হরেক রকমের মনগড়া তত্ত্ব উপাত্ত দিয়ে জাতিকে বিভক্ত করে আদিত্যবাদীদের এদেশে সুযোগ করে দিচ্ছে ।তাই নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত থেকে বাঁচানোর পথ হল সঠিক ইতিহাস নির্ভর বই তুলে দেওয়া।আর ইতিহাস নির্ভর বইগুলো সহজেই সূলভ মূল্যে খুঁজে পাওয়া যায় বইমেলায়।
08,মার্চ 21তারিখ ঢাকা একুশের বই মেলা শুরু হয়েছে ।বইমেলা উদ্বোধন করার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন “এবারের বইমেলা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের বিষয় ।করোনা মোকাবিলায় টীকা কার্যক্রম শুরু করেছি।তার পরেও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে বইমেলায় আসতে হবে।কেননা বই মেলা আমাদের জ্ঞানের দরজা প্রশস্ত করে।”
এক সময় বই উপহার দেওয়া নেওয়ার সংস্কৃতি ছিল ।বাঙালির ঐতিহ্যেগাথা বই উপহারের প্রচলন টি আবার ফিরে আসা দরকার।সামাজিক অবক্ষয় রোধ এবং মেধা সম্পন্ন সচেতন মানুষ হিসেবে তৈরী হতে বই আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখাবে সারাক্ষণ ।সব সময় ।পারস্যের বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়ামের মতে “রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে,প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে ।কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়।”
জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু
**********************************
লেখক-বদরুল ইসলাম বাদল
নব্বই দশকের সাবেক ছাত্র নেতা ।
ঢেমুশিয়া,চকরিয়া,কক্সবাজার ।
badrulislam2027@gmail. com


এই বিভাগের আরো খবর