নিউজ ডেস্কঃ
আজ : ২২শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, শনিবার প্রকাশ করা : ডিসেম্বর ২৯, ২০২১

  • কোন মন্তব্য নেই

    বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ নিশ্চুপ কৃষি বিভাগ

    এম এ আলম,চৌদ্দগ্রাম প্রতিনিধি:শীত ঋতু এলেই গ্রামীণ সংস্কৃতিতে খেজুর রসের কথা মনে পড়ে। ফোঁটা ফোঁটা সঞ্চিত রস নির্গত হবে চোং দিয়ে। হাঁড়িতে জমে রসের ফোঁটা। এভাবে একটি গাছ দৈনিক গড়ে ৫-৬ লিটার রস দিয়ে থাক। কথিত আছে ‘খালি কলসি রেখে দিলে ভরে যায় রসে, সেই রসে দিয়ে জ্বাল মন ভরে সুবাসে’। আবার গাভীর সাথে তুলনায় বলা হয় ‘মাইট্যা গোয়াল কাঠের গাই-বাছুর ছাড়া দুধ পাই’। কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ শহরে বিরল। শীতের সকালে খেজুর রস, মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসি দারুণ প্রাণশক্তি। কবির ভাষায়, ‘এমন শীতলমিষ্টি কোথা আছে নীরব পান মাত্র তৃষিতের জুড়ায় শরীর’। তাই এ গাছকে অনেকে শখের বসে ‘মধুবৃক্ষ’ বলে থাকে।

    একসময় গ্রামীণ জনপদে খেজুর রস নিয়ে পায়েস পিঠার উৎসব, রাত জেগে সিন্নি রেঁধে খাবার উৎসব, গভীর রাতে গাছে গাছে ঝুলে খেজুরের রস খাওয়া সহ অনেকের জীবনে চুরি করে রস খাওয়া শৈশবের অম্লান স্মৃতি হয়ে আছে আজো। গ্রামীণ মেঠোপথ আর খেজুর গাছের সারির সেই মুগ্ধতাও আজ বিলীন হবার পথে।
    প্রকৃতির তৈরি চোখ জুড়ানো খেজুর গাছের সারি আর রসের হাঁড়ির দেখা মিলে না এখন আর। দোয়েল, বুলবুলি, শালিকসহ নানা রকম পাখি রসের চুঙ্গিতে বসে রস খাচ্ছে আর উড়াল দিচ্ছে, মৌমাছিরাও রস খাওয়ার আশায় ভোঁ ভোঁ করে উড়ে বেড়ায় না।চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা ইউনিয়ন দুর্গাপুর গ্রামের গাছি ছদ্মনাম মোঃ রফিকুল ইসলাম বললেন আগে রস বিক্রির জন্য হাটে যেতে হতো। আর এখন গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামাতে দেরি হয় কিন্তু হাঁড়ি শেষ হতে দেরি হয় না। সকাল ৭টার ভেতরে শেষ হয়ে যায় রসের হাঁড়ি। ঠিক এমনই চিত্র এখন উপজেলার সকল গ্রামেরই। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে খেজুর গাছের সংখ্যা ও গাছি কমতে কমতে দুই দশকের তুলনায় এক দশমাংশই বিলুপ্ত প্রায়। কিন্তু কমেনি খেজুরের রসের গ্রাহক সংখ্যা। কমেনি এর কদর ও চাহিদা। উপজেলার সর্বত্র মিলে কয়েক হাজার খেজুর ছিল এক সময় এখন তা অর্ধ হাজারের নিচে নেমে এসেছে বলে অভিমত পর্যবেক্ষক মহলের। অথচ গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী কিছু গাছের মধ্যে খেজুর গাছ ছিল অন্যতম। আমরা অপেক্ষার প্রহর গুনতাম শীতকালের জন্য। কারণ শীত আসলেই খেজুরের রস ও খেজুরের মিঠা (রাভ মিঠা) গন্ধে গ্রামীণ জনপদ মৌ মৌ করতো। শীত আসলেই গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়তো খেজুর গাছ রসের উপযোগী করতে পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত হতে। এতে গাছিরা এই সময় অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতো। কালের বিবর্তনে অর্থনীতির চাকাকে চাঙ্গা করতে গিয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক গাছের মত খেজুর গাছকেও কেটে ফেলা হচ্ছে।
    ফলে বিভিন্ন পিঠা, পুলি ও পায়েসসহ নানা প্রকার খাবার তৈরির জন্য খেজুরের রস ছিল অন্যতম উপাদান। এ জন্য গাছিদের চাহিদার কথা বলে রাখতে হতো। ফলে যাদের খেজুর গাছ ছিল না তারাও রস খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতেন না। তখন শীতে আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করত। বিশেষ করে পৌষ-মাঘ শীত মওসুম এলে গাছিদের আনন্দের সীমা থাকত না। খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য মহাব্যস্ত হয়ে পড়তেন তারা। উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নের সারপটি গ্রামের মোঃ বেলাল হোসেন সরকার, বলেন, ছোট বেলা থেকে এখনো কাঁচা রসের পায়েস খাওয়ার কথা এখনো ভুলতে পারি না। আমাদের ছেলে – মেয়েরা তো আর সেই খোলাসালি, ধুই ( ভাপা) পিঠা, পুলি-পায়েস খেতে পায় না। চৌদ্দগ্রাম উপজেলার অনেক গ্রামের মাঠে আর মেঠোপথের ধারে কিছু গাছ দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ করা হয় না। শীত মৌসুমে সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা বলে শেষ করা যাবে না। কৃষি বিভাগতেও কখনো খেজুরের গাছ আবাদ নিয়ে কথা বলতে বা, কৃষি মেলায় খেজুরের গাছ রোপণে উদ্বুদ্ধ করার পরামর্শ দেয়া হয় না।
    প্রাপ্ত তথ্যে আরো জানা গেছে খেজুরের বহুল ব্যবহার নিয়ে বর্ণনার শেষ নেই। রস দিয়ে নানা রকম পিঠা, পায়েস, গুড়, কুটির শিল্প, আয় ও কর্মসংস্থান হয়। সার্বিক বিবেচনায় খেজুর সমধিক গুরুত্ববহ একটি প্রজাতি। এই উদ্ভিদ মানবদেহের জন্য উপকারী বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান সমৃদ্ধ। খেজুর ফল ফাইবার ও ভিটামিন সমৃদ্ধ। খাদ্যোপযোগী। তাই আমাদের আবহমান কাল থেকে পেয়ে আশা গ্রাম বাংলার এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য সকলকে বেশি বেশি করে খেজুর গাছ লাগানো জন্য এগিয়ে আশা উচিৎ।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published.

    © স্বত্ব আজকের কাগজ ২৪ ডট নেট ।২০১৮-২০২১
    সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুল হাসান চৌধুরি
    পিয়াস বিল্ডিং পূর্ব শাহী ঈদগাহ, টিবি গেইট , সিলেট
    ফোন: ০১৭১১০০০২১৪ , ইমেইল: ajkerkagoj24@gmail.com
    %d bloggers like this: