যুবলীগের জরিপে এগিয়ে আছে তাপস ও শাহীন

2

রাজনিতিঃবিশেষ প্রতিনিধি : আগামী ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সপ্তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন। এ সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হবে আওয়ামী যুবলীগের নতুন কমিটি। সম্মেলনে কে হবেন চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক? এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা। শুধু জল্পনা-কল্পনাতে সীমাবদ্ধ নয়। বয়স, ক্লিন ইমেজ, সাংগঠনিক দক্ষতা, মেধা-প্রজ্ঞা, সাবর্জনীন গ্রহণযোগ্যতা, ছাত্রজীবন, পারিবারিক পরিচয় ইত্যাদি নিয়ে চলছে গাণিতিক বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ।

চেয়ারম্যান হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, তার বড়ভাই শেখ ফজলে শামস পরশ, বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান ও এডভোকেট বেলাল হোসেন।

সাধারণ সম্পাদক পদে যাদের যারা আলোচনায় আছেন, বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনজুর আলম শাহীন, মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, সুব্রত পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক বদিউল আলম বদি, ফারুক হাসান তুহিন, অর্থ সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র হালদার।

ক্লিন ইমেজ, সাংগঠনিক দক্ষতা, মেধা-প্রজ্ঞা, সাবর্জনীন গ্রহণযোগ্যতা কার বেশী এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে বাংলাদেশ নিউজ এজেন্সি (বিএনএ) দু’সপ্তাহ মাঠ পর্যায়ের যুবলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে এক জরিপ চালায়। ক্লিন ইমেজ, সাংগঠনিক দক্ষতা, মেধা-প্রজ্ঞা, সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এ চারটি কল্পানুমানের ভিত্তিতে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ৭টি প্রশ্নে পরিচালিত হয় এ জরিপ। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণমূলক জরিপের ফলাফলে চেয়ারম্যান পদে শেখ ফজলে নুর তাপস, সাধারণ সম্পাদক পদে মনজুর আলম শাহীন এগিয়ে আছেন।

পরিচালিত জরিপ ফলাফল বিশ্লেষণ-পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্নোত্তরে আরো দেখা যায়, শেখ ফজলে নুর তাপস, মনজুর আলম শাহীনের রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। রয়েছে সাংগঠনিক দক্ষতা। নেই সাংগঠনিক ক্ষমতার অপব্যবহার দৃষ্টান্ত। সংগঠনের জন্য রয়েছে ত্যাগ। ভোগ বিলাস তাদের বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আর্দশ-উদ্দেশ্য থেকে দুরে রাখতে পারেনি। তৃণমুল পর্যায়ের মতামত ও সার্বিক বিবেচনায় শেখ ফজলে নুর তাপস চেয়ারম্যান, মনজুর আলম শাহীন সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সম্ভবনা বেশী। তবে সব কিছু নির্ভর করছে গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দু’জনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তথ্যাদি পাঠকদের নিকট উপস্থাপন করা হলো।

শেখ ফজলে নুর তাপস: বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির পুত্র।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারসহ আরো যাদের হত্যা করা হয়েছিলো তাদের মধ্যে শেখ ফজলে নূর তাপসের বাবা শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা মা আরজু মণিও ছিলেন। তখন তাপসের বয়স ৪ বছর।

শেখ ফজলে নুর তাপস বর্তমানে জাতীয় সংসদে ঢাকা-১০ (ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ)এর প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি ২০০৮ সালে প্রথমবারের মত সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ সালেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

পেশায় আইনজীবি শেখ ফজলে নুর তাপস ১৯৯৭ সালে ইংল্যান্ড থেকে বার এট ল ডিগ্রী লাভ করেন।পরে বাংলাদেশে এসে আইন পেশায় যুক্ত হন। ২০০৭ সালে তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা দায়ের করে।এসব মামলায় আওয়ামী লীগের সিনিয়র আইনজীবীদের পাশাপাশি সব মামলা পরিচালনা করেন ব্যারিস্টার তাপস। সবগুলো মামলায় বিজয় লাভ করেন।পরবর্তীতে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবি হিসেবে কাজ করেন।মামলায় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হন।আসামীদের বেশীর ভাগের মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়। মামলার শুনানি অবস্থায় ২০০৯ সালের ২১শে অক্টোবর মতিঝিলে বাংলার বাণী ভবনের নিচে তাপসের গাড়ির ওপর বোমা হামলা ঘটনা ঘটে। এ সময় তিনি প্রাণে রক্ষা পেলেও তার ল’ চেম্বারে দুই অফিস কর্মকর্তাসহ ১৩ সমর্থক আহত হয়।

প্রসঙ্গত: আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবিরা বঙ্গবন্ধু আইনজীবি পরিষদ ও আওয়ামী আইনজীবি পরিষদ নামে দুটি সংগঠনে দীর্ঘদিন যাবত বিভক্ত ছিল। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শেখ ফজলে নুর তাপসের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হন। তিনি “বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ” এর সদস্য সচিব।

যেখানে অন্যায় সেখানে ফজলে নুর তাপস এমন একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে।তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যা করার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত করেন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন করার জন্য তিনি মাহফুজ আনামের বিচার দাবী করেন।র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)এর বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের জন্য তিনি এর সমালোচনা করেন।সম্প্রতি আইনজীবীদের এক সভায় তাপস কেসিনো কান্ডে জড়িত যুবলীগ নেতাদের সমালোচনা করেন এবং গ্রেফতারের দাবি জানান।তার বক্তব্যের পরদিনই সম্রাটকে আটক করা হয়। একজন ক্লিন ইমেজ নেতা হিসাবে যুবলীগের ভবিষ্যত চেয়ারম্যান হিসাবে মাঠ পর্যায়ে তার নাম সবচেয়ে বেশি শুনা যাচ্ছে।

মনজুর আলম শাহীন: বর্তমান যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সাধারণ সম্পাদকের অনুপস্থিতিতে তিনিই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ফেনী সদরের মাস্টার পড়ায় এক আওয়ামী লীগ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মনজুর আলম শাহীন।তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ফেনী পাইলট হাই স্কুলে অধ্যায়নকালীন যুক্ত হন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে। পালন করেন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন ফেনী কলেজে। কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেন শাহীন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘদিন কারা ভোগ করেন।

ব্যানিজ্য বিভাগের মেধাবী ছাত্র মনজুর আলম শাহীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান (অর্নাস)এ ভর্তি হন। শুরু থেকে ইসলামী ছাত্র শিবিরে রোষানলে পড়েন। নানা ভাবে নির্যাতিত হন। তবু বঙ্গবন্ধুর আর্দশ থেকে চ্যূত হননি। ১৯৮৬ সালে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘদিন কারা ভোগ করেন।

১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে হারাতে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য গঠিত হয়েছিল তার অন্যতম রূপকার ছিলেন শাহীন।ছাত্রঐক্য চাকসু এবং এফ.রহমান হল ছাড়া সব হলে জয় লাভ করে।পতন হয় ছাত্রশিবের দূর্গের।

পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন। তারই ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের (মাইনু-ইকবাল) কমিটির সহসভাপতি হন। দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক এবং কেন্দ্রীয় যুবলীগের (নানক-আজম) কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে। মনজুর আলম শাহীন বর্তমানে যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক। যুবলীগের অন্যদের মতো কেসিনো ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সচিবালয়ে তদবির এর সঙ্গে নিজেকে দূরে রেখেছেন। গন্ডালিকায় গা ভাসাতে না পেরে, নীতি আর্দশের সঙ্গে আপোষ না করতে অনেকটা অভিমান করে বেশ কিছু সময় বিদেশে অবস্থান করেন।পরিস্থিতি পাল্টে গেলে শাহীন আবারো রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। সাড়াও পাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত: তার বড় ভাই শাহ আলম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। তার স্ত্রী শামীমা আক্তার ফেন্সি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্যাসিনো কান্ড, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে আলোচনায় রয়েছে যুবলীগের অব্যাহতি প্রাপ্ত সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক। অভিযোগ তার পৃষ্টপোষকতায় চলতো ঢাকার ৬০টি স্থানে ক্যাসিনো । যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি সম্রাটসহ তার সরাসরি অনুসারিদের অনেককে র‌্যাব গ্রেফতার করেছে।ওমর ফারুক নগদ অর্থ নিয়ে সারা দেশে যুবলীগে অনেককে পদ দিয়েছেন। তার অফিস পিয়ন আনিসকেও যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করেছেন। সংগঠনকে ব্যবহার করে পিয়ন আনিসও অর্ধশত কোটি টাকার মালিক! এসব নেতিবাচক কর্মকান্ডের জন্য ওমর ফারুক ও তার পৃষ্টপোষকের অনুসারিরা এবার নেতৃত্বে আসছে না এটা অনেকটা নিশ্চিত।

যুবলীগকে নেতিবাচক ধারা থেকে বের করে ইতিবাচক ব্র্যান্ডে যুক্ত করতে চান আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুবলীগকে ঢেলে সাজাতে এবার বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সে কারণে শুদ্ধি অভিযানের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণ বিশ্বস্ত, প্রতিশ্রুতিশীল ও মেধাবী নতুন নেতৃত্বের খোঁজ করছেন তিনি।

সার্বিক প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে এখন যুবলীগ একটা ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করছে। এ সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গ সংগঠন প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব ও উদ্দেশ্য সংক্রান্ত ইতিবাচক একটি ‘ম্যাসেজ’ পাবে। সে কারণে শাসকদল ও বিরোধী দলের সবার দৃষ্টি এখন যুবলীগের সম্মেলনের দিকে। যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেই এমন সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কেমন তারুণ্য নির্ভর হবে যুবলীগ? সংগঠনটির এ ক্রান্তিকালে কারা আসছেন নেতৃত্বে? সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আগামী ২৩ নভেম্বর বিকাল পর্যন্ত।

বিএনএনিউজ২৪.কম/এসজিএন/এহক।