কখনো কখনো স্রোতের বিপরীতে চলতে হয়

নাদিয়া পাঠান পাপনঃ সাল ২০০৯,বদরুন্নেসা কলেজ হোস্টেল ছাড়ার পর থেকে আমি সাবলেটে থাকতাম। যার বাসায় ভাড়া থাকতাম সেইভাবী আমার পোশাকের ডিজাইন খুব পছন্দ করতেন। মাঝে মাঝে ভাবির পোশাকের ডিজাইন আমাকে করে দিতে হতো।

একদিন টেইলার্সে গেলাম,যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি নেমে গেল বাইরে তাকাতেই দেখলাম একটা ভ্যানের মধ্যে নীল পলিথিন গায়ে দিয়ে কে যেন ঘুমিয়ে আছে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ছে। কাটিং মাস্টার কে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা ওখানে কে এভাবে ঘুমিয়ে আছে? বৃষ্টির মধ্যে ঘুমানোর খুব ইচ্ছা ছিল সেজন্য ঘুমাচ্ছে বললেন তিনি। সবাই একটা হাসি দিলেন।বিষয়টা অদ্ভুত লাগেনি।এরকম উদ্ভট অভ্যাস কিছু আমারও আছে। বুঝলাম আমার মত এ ধরনের পাগল পৃথিবীতে আরও আছে ।

বৃষ্টি পাগল না হলে কেউ এভাবে বৃষ্টির মধ্যে ঘুমায়। মৃত মানুষ হলে কেউ তার সাথে এরকম তামাশা করত না। তাই আমি বললাম ভাই লোকটাকে কে ডেকে বলেন বাড়ি যেতে ঠান্ডা লেগে যাবে।।এবার কাটিং মাস্টার উত্তর দিলেন আপা লোকটা মারা গেছে সকালে সবজি বিক্রি করতে এসেছিল। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।।

পুরনো ঢাকার লোক দেরকে আমি খুব ধার্মিক বলেই জানি সেদিন বেশ অবাক হয়েছিলাম একটা মৃত লাশকে এভাবে রেখে সবাই লাশটাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। সেদিন আমার প্রচন্ড রাগ হয়েছিল।। খুব অনুরোধ করলাম তাদের লাশটাকে এমন কোথাও রাখতে যেন বৃষ্টির ফোঁটায় লাশের কষ্ট না হয়। আমার কথায় কেউ কোন পাত্তাই দিলেন না বরং আরো হাসাহাসি করতে লাগলেন। উল্টো ঠাট্টা করে আমাকে বললেন আমি যেন লাশটাকে কোথাও রেখে আসি।। খাজে দেওয়ান প্রথম লেন অনেকটা ছোট্ট একটা বাজারের মতো, সেখানে বৃষ্টির মধ্যে ভ্যান চালানো একটা মেয়ের জন্য একেবারেই অশোভনীয়। কিন্তু একটা লাশ কে বৃষ্টির মধ্যে এভাবে ফেলে রাখা তার চেয়েও অমানবিক।

কখনো কখনো স্রোতের বিপরীতে চলতে হয়। আমিও তাদের জিজ্ঞেস করলাম ভ্যান রাখার কোন জায়গা আছে উনারা আমাকে উত্তর দিলেন বাইতুন নুর জামে মসজিদের নিচে খালি জায়গা আছে সেখানে রাখা যাবে।তবুও বলছেন না ঠিক আছে আমরা লাশটাকে মসজিদের নিচে খালি জায়গাটায় রেখে আসি। পুরনো ঢাকায় যারা থাকেন তারা জানেন অল্প বৃষ্টি হলে রাস্তার অবস্থা কি হয়? যাইহোক বৃষ্টির মধ্যে ভ্যান এর উপরে লাশ টাকে টেনে নেয়া আমার জন্য খুব কষ্টকর ছিল ভ্যানটা যখন টানছিলাম সবাই আমার দিকে হা করে দেখছিলেন তবুও কেউ ভ্যান টাকে একটু ধাক্কা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ মনে করলেন না। প্রচন্ড রাগের সাথে এবার আমি ভাবীর দিকে তাকালাম উনি আমার চোখের ভাষা বুঝবেন বুঝতে পারিনি। ভাবী নিতান্তই একজন সহজ সরল মানুষ রাগ ক্ষোভ ওগুলোর ভাষা মুখে না বললে বুঝেন না।

ভাবি আর আমি যখন ভ্যানটাকে টেনে মসজিদের কাছাকাছি নিলাম ঠিক তখনই চার-পাঁচজন পুলিশ আমাকে থামালেন বললেন লাশ নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন উনি আপনার কে হন?আমি বললাম মসজিদের নিচে খালি জায়গাটায় লাশটাকে রাখবো। আর উনি আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ হন না একজন মুসলমান হিসেবে ভাই হন।পুলিশদের প্রত্যেকের হাতে তখন চায়ের কাপ, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে।চা খাচ্ছেন? চা খান। এবার ওরা লাশ নিয়ে না আমাকে নিয়ে একটা তামাশার হাসি দিলেন। আর রাগ সহ্য হলো না। অনেক কিছু বলার ইচ্ছে ছিল কিছুই বলতে পারিনি শুধু বললাম একজন মৃত লাশের উপর একটা মাছি বসলে কতটা কষ্ট হয় মুসলমান হিসেবে আপনার পরিবার সেই শিক্ষা আপনাদের না দিলেও আমার পরিবার আমাকে সেই শিক্ষাটা খুব ভালোভাবে দিয়েছে….

মানুষের প্রতি মানুষের এমন আচরণে সেদিন আমি কতটা কেঁদেছিলাম তা কারো নজরে পড়েনি কারণ বৃষ্টি আমার চোখের জল সেদিন একাকার ছিল…..

ভালো থাকুক প্রতিটি প্রাণ। জাগ্রত হোক সুপ্ত বিবেক।সৃষ্টিকর্তা আমাদের ক্ষমা করুন কারণ তিনি সর্বোচ্চ ক্ষমাশীল।। লেখকের ফেইসবুক অয়াল থেকে সংগৃহী।
লেখকঃ নাদিয়া পাঠান পাপন
সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ

সংবাদকর্মি নিয়োগ চলছেঃ-

দেশের সকল জেলা উপজেলাইয় সংবাদকর্মি নিয়োগ চলছে । আমাদের সাথে কাজ করতে সরাসরি যোগাযুগ করুন ০১৭১১০০০২১৪