শোকের দিনে কেন আনন্দ উৎসব!

10

আজকের কাগজ : ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস, শহিদ বুদ্ধিজীবী হারানোর মাস। দেশভাগ থেকে শুরু করে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাধীন একটা দেশের আকাঙক্ষার দিন গোনা শেষ হওয়ার মাস। নতুন দেশ জন্ম নেয়ার মাস।

আর শোকের দিনগুলিতে আমরা আলো জ্বেলে, বাজনা বাজিয়ে হল ভাড়া করে বিয়ে জন্মদিন বা ৫০ বছরের বিবাহবার্ষিকী পালনের মতো ভাঁড়ামিপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। আমাদের বিবেকে বাঁধে না। আমাদের চেতনা আসলে কিসের সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। আমরা ঈদের দুটি দিনকে যদি বিয়ে জন্মদিন বা ওই জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে বাদ রাখতে পারি, তাহলে শোকের দিনগুলো যেমন ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৫ আগস্ট, ১৪ ডিসেম্বর কেন পারি না? আপনার পরিবারের কারো মৃত্যুদিবসে কি আপনি কোনো আনন্দ অনুষ্ঠান করেন? তা যদি না করেন আমাদের শহীদ ভাইদের মৃত্যুদিবসে কেন আনন্দ অনুষ্ঠান করবেন। অনুষ্ঠানটা দুদিন পিছালে কি আপনাদের আনন্দটা একটু কম হয়? নাকি ওই দিনগুলোতে অনুষ্ঠান করে প্রমাণ করতে চান যেহেতু ওটা শোকের দিন ওদিন অনুষ্ঠান করে আপনারা অন্যদিনের চেয়ে বেশি আনন্দ পান। আপনি আপনারা স্যাডিস্ট! এসবে দিনে অনুষ্ঠানের কমতি নেই ।

 

এই মাসেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জানি না সামনে কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য; এই বিজয়ের মাসে!

আমরা স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, চেতনা নিয়ে বড় বড় কথা বলি। কেউ কেউ মরিয়া হয়ে উঠি বঙ্গবন্ধুর কতটা কাছে ছিলেন সেটা প্রমাণ করার জন্য। এ দেশ নির্মাণে তার/তাদের ত্যাগ তিতিক্ষা বীরত্ব সাহসিকতা কমিটমেন্টের গল্প করতে গিয়ে থামতে ভুলে যান। বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে বলতে কেঁদে বুক ভাসান। হ্যাঁ; এটাই এখন মোটামুটি আমাদের একশ্রেণির সুবিধাবাদি চেতনাবাজের চরিত্র। তারা আবার বিভিন্ন বয়সী, তরুণ থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত। বৃদ্ধদের সুবিধা বেশি। বয়স বেশি হলে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাবার সুযোগ বেশি, মুক্তিযোদ্ধা হবার সুযোগ বেশি।

 

এছাড়াও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধায় ভরে গেছে দেশ। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হলেও মুক্তিযোদ্ধার কোন সঠিক তালিকা নেই। নেই রাজাকারের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা । যখন যে সরকার আসেন তাদের ইচ্ছেমতো তালিকা তৈরি হয়। কিছু মানুষ সুবিধা পায়, কিছু বিতর্ক হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা দেয়ায় মুক্তিযোদ্ধা হবার প্রবণতা বেড়েছে। মাসে বেশ ভালো অঙ্কের একটা ভাতা পাওয়া যায়, চিকিৎসা, যাতায়াত, চাকরিজীবীদের অধিক বয়স অবধি চাকরি এমন নানান সুবিধার লোভে এক শ্রেণির মানুষ সার্টিফিকেট যোগাড় করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আর তাদের এ ধরনের দু নম্বর সার্টিফিকেট জোগাড় করে দেয়ার জন্য এক কিছু লোকও রয়েছে।

 

কিছু মানুষ বড় সুযোগ সন্ধানী। তারা আওয়ামী লীগের আমলে আওয়ামী লীগ, বিএনপির আমলে বিএনপির সৈনিক, জাতীয় পার্টির আমলে জাতীয় পার্টি। পদ পদবি জমা জমা বাড়ি ঘর কোনো কিছু পেতে বা নিতে তাদের অসুবিধা হয়নি । দিতেও কার্পণ্য করেনি কেউ । কারণ ওই সুবিধা নেবার কৌশল জানা । তারা এখনও চেতনার ফেরিওয়ালা । পরেও ফেরি করবেন যতদিন বাঁচেন।

এদেশের আপামর জনগণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল । এটা ছিল জনযুদ্ধ। যে মানুষগুলি গ্রামে গঞ্জে আছেন, যুদ্ধ করেছেন, জীবন দিয়েছেন, পঙ্গু হয়ে পড়ে আছেন তাদের কথা মোটেও আলোচিত হয় না। কখনও কোন অনুসন্ধানী সাংবাদিক তাদের আলোয় তুলে আনেন, তারা কিছুটা আলোচিত হন। তারপর অন্ধকারে হারিয়ে যান। আর অগনিত পড়ে থাকেন আলোচনার বাইরে। তারা পদ পাননি, পদবি, জমি বাড়ি কিছুই পাননি। অনেকেরই মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নেই। এই জিনিসটা যে এক সময় এত দরকারি জিনিস হবে তারা বোঝেন নি। প্রাণের তাগিদেই তো মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। আবার এক বিরাট সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা জেনেও সার্টিফিকেট নেননি। তারা মনে করেছেন, দেশের জন্য যুদ্ধে গিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নেবার জন্য তো না। তাই তারা মুক্তিযোদ্ধার ভাতারও বাইরে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিরাট অঙ্কের ইনকাম ট্যাক্স দেন এমন অনেক লোক মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান, অথচ গ্রাম গঞ্জের দরিদ্র প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরেন।

কিছু মানুষ ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়েছেন আবার কিছু মানুষ ভুয়া তথ্য দিয়ে সুযোগ নিয়েছেন।স্বামী শহীদ হবার পর বিয়ে করেছেন, আজও বিবাহিত এমন শহীদ জায়া এখনো সদর্পে আছেন। আর সেই শহীদ জায়ারা যারা অল্প বয়সে স্বামী হারিয়ে বৈধব্যেকে সঙ্গী করে জীবন কাটিয়ে দিলেন তাদের কথা কেউ জানে না। নিউমনিয়াতে মৃত স্বামীকে শহীদ বানিয়ে ফেলেছেন এমন সুযোগ সন্ধানীও আছেন। আর তাদের কথাই বা বলি কেন, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাতে তো দেশ সয়লাব যা আগেই বলেছি। সচিবদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট যখন বাতিল হয় লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করে। মরে যেতে ইচ্ছে করে যখন মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার জন্য বিদেশিদের দেয়া মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা স্মারকে সোনার বদলে পিতল পাওয়া যায়!

মুক্তিযোদ্ধা আর বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ বলে যারা দাবি করে তারাই এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন বেশি করে। আর যারা সেসব অনুষ্ঠানে যায় তাদের অনেকেও নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক বলতে সোচ্চার। শোকের দিনগুলোতে কোনোরকম আনন্দ আনুষ্ঠান না করার বাধ্যবাধকতা করে আইন পাশ করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ। সচেতন জনগণের কাছে প্রার্থনা, শহিদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আনন্দ অনুষ্ঠান বর্জন করুন শোকের দিনগুলোতে। যারা এসব করে তাদের প্রাণ থেকে ঘৃণা করুন।

আমাদের যে শুধু অন্ধকার দিক আছে তা নয়। আলোর দিকও রয়েছে। আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ। অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের যে কোন দিকে তাকালেই চোখে পড়ে। এখন প্রয়োজন মনোগত দিকটাকে আরো উজ্জ্বল করা।

এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের মাসেই সংগঠিত হতে চলেছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে। রাস্তাঘাট ভরে গেছে পোস্টারে, ব্যানারে। ঘরে বসেও শুনতে পাচ্ছি নানান ভাই-এর পক্ষে প্রচারণা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতের পর কোটালিপাড়া থেকে তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। এক্যফ্রন্টও নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে সিলেটে মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে। খালেদা জিয়া কারাভ্যন্তরে রয়েছেন। তার নির্বাচনের ব্যাপানে হাইকোর্টের বে বিভক্ত রায় দিয়েছে। এখনো তার বিষয়টি অমিমাংসিত। এদিকে নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসছে। ছোট খাট কিছু ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের সহিংসতার কোনো ঘটনা এখনও ঘটেনি। নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক আসবেন না। দেশি পর্যবেক্ষকদের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। নির্বাচনের আগে সেনা মোতায়েন করা হবে। কতিপয় বিরোধী দলের আপত্তি আমলে না নিয়ে সরকার বেশ কিছু আসনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নির্বাচনে ভোট দান জনগণের অধিকার। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই হয়েছে যে, ভোট নিয়ে জনগণের তেমন আগ্রহ নেই। বরং ভোট এগিয়ে এলেই সহিংসতা হবার আকাঙক্ষায় জনগণ কুণ্ঠিত হয়ে থাকে। অনেকের ইচ্ছে থাকলেও ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে যান না।

এটা ঠিক নয়। ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজের পছন্দের প্রার্থিকে নির্বাচন করার অধিকার ভোটারের সাংবিধানিক । তাই ভোটারের উচিৎ ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যাওয়া। আর সরকারের উচিত ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা। উভয়পক্ষ যদি এ ব্যাপারে সচেতন থাকে তবে এই বিজয়ের মাসে আমরা একটা নির্ভেজাল শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার পাবো।

 

লেখক : আফরোজা পারভীন
কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক।