তাহিরপুর টাংগুয়ার হাওর পাড়ের জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা

1

আহাম্মদ কবির সুনামগঞ্জ তাহিরপুর হতেঃশীতের সকালে যখন শহরে বসবাসরত সাহেবগন গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সংবাদপত্র চোখ রখেন, ঠিক তখনেই সুনামগঞ্জ তাহিরপুর টাংগুয়ার হাওরপাড়ের অসহায় মানুষগুলো লগি-বইঠা হাতে নিয়ে ছুটে যান হাওরে, জীবিকার সন্ধানে।কিন্তু এই হাওরপাড়ের মানুষগুলোর লক্ষ্য একটাই সন্তানদের মুখে দু’বেলা দু-মুঠো ভাত তুলে দেওয়া। ওদের আবার শহরের সাহেবদের মত খুব বেশী চাওয়ার নেই। বিশাল অট্রালিকা কিংবা অবকাশ যান।যদিও শহরাঞ্চলের সাহেবদের কাছে হাওর একটি রোমান্টিক শব্দ,কিন্তু হাওরাঞ্চলের মানুষের কাছে এই হাওরই হচ্ছে একমাত্র জীবিকার আধার।যে হাওরে গত দু-মাসের ব্যবধানে পিতা – পত্র সহ চার জনের করুন মৃত্যু হয়েছে ।তাদের মধ্যে কেউ বজ্রপাতে, কেউবা আবার বন্যার কবলে পড়ে।তা জানা সত্যেও ক্ষুধার তাড়নায় বাচ্চাদের ক্ষুধা নিবারনের জন্য, প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেড়িয়ে যায় এই হাওরেই ।সুনামগঞ্জ টাংগুয়ার হাওরের মানুষগুলো যেন,আলোর নিচে অন্ধকারের মতো সবার চোখের আড়ালেই রয়ে যয়। যে হাওরকে নিয়ে বিশাল পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও,কর্তৃপক্ষের অবহেলায় তা আজ বাস্তবমুখী নয়। আর এই হাওরবাসী হাওরের মাছের উপর নিজেদের নির্ভরশীলতা কমাতে শত চেষ্টা করলেও, বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায়, হাওরের মাছের উপর নির্ভরশীললতা দিনদিন বেড়েই চলছে। দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের তাহিরপুর /ধর্মপাশা উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে বিস্তৃত, ৫১টি ছোট-বড় হাওর নিয়ে এই টাংগুয়ার হাওর যাহা দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট হিসাবে ঘোষিত। দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চল থেকে এটা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এখানকার ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, যানবাহন সবকিছুই ব্যতিক্রম। বছরের প্রায় ৪ মাস গোটা হাওর এলাকা পানিতে ডুবে থাকে। আর এই ৪ মাসে পাল্টে যায় হাওরাঞ্চলের জীবন ও জীবিকার গল্প।পাহাড় ও আকাশ এবং হাওরে ঢেউয়ের মিতালী দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে মানুষ ছোটে আসে এই টাংগুয়ার হাওরে ,আর এই টাংগুয়ার হাওরপাড়ের মানুষরা জীবনকে পার করেন কষ্টের চাদরে মুখ লুকিয়ে । সেটা কতটা কষ্টের তা হয়তো ওদের একজন না হলে অনুভব করা যাবে না কখনোই। তাদের জীবনযাপনে কখন কতটা দুঃখ আসবে সেটা খুব একটা নিরিখ করে বলা যাবে না।এটা শুধুই প্রকৃতির খেলা। গ্রীষ্মের সময় গভীররাত পর্যন্ত জমজমাট আড্ডা চলে টাংগুয়ার হাওরপাড়ের হাটবাজার আর রাস্তার ধারে।এই হাওরাঞ্চলের মানুষগুলো হাওরের মাছ আর একটি মাত্র বোর ফসলে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন।এর ঠিক এই সময়েই ফসল উঠে, কৃষকের ঘরে থাকে গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু। এ সময় টুকু তারা আনন্দ আর আয়েশে কাটিয়ে দিলেও অন্য ঋতুতে তাদের চিত্র ভিন্ন। যদি আবার অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে এক ফসলের ওপর নির্ভরশীল কৃষকের বোরো ধান ধুয়ে মুছে নিয়ে যায় । ধান কাটা, ধান ভাঙা আর গোলায় ধান ভরার কাজে ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও। কৃষকের চোখে পানি ঝরা ছাড়া আর কিছুই থাকেনা, তখন তারা একটি অনিশ্চিত জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ধান আর মাছ, হাওরপাড়ের মানুষের জীবন, মূলত এই দুইয়ের সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত হাওরবাসী । বছরের অর্ধেক সময় হাওরজুড়ে পানি থাকায় এসব এলাকার মানুষ একটি ফসল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। আর হাওরজুড়ে যখন পানির বিস্তৃতি থাকে তখন তাদের দিন কাটে মাছের সন্ধানে। বছরের অর্ধেক যদি হাওরের বোর ধান দিয়ে হাওরপাড়ের জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দেয়, বাকি অর্ধেক দেয় হাওরের মাছ দিয়ে। মাছ-ধানে এই হাওরপাড়ের অবহেলিত মানুষের দিন কাটে হাসি আর কান্নায়।এই হাওরাঞ্চলের জনগোষ্ঠী প্রজন্মকে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে, হাওরের মাছের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে শত ইচ্ছা থকলেও।বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হাওরের উত্তাল ঢেউ ।এবং এই বর্ষা মৌসুমেই বিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় হাওরপাড়ের অর্ধশতাধিক গ্রামের হাজারও শিশু-কিশোর। বৃষ্টির নিক্ষেপিত পানি যখন জললীলাতে পরিণত হয় তখন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পায়ে হেঁটে যাওয়ার কোন সুযোগ থাকেনা । ফলে বর্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৬ মাস যে সমস্ত গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই সেসকল গ্রামের শিশু-কিশোররা বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়ে।এবং এই হাওরপাড়ের শিশুরা ধিরে ধিরে,হেমন্ত মৌসুম আসলেই, পিতা-মাতাদের সাথে কৃষি কাজে জড়িয়ে পড়ে। যে কারণে অনেক শিশু-কিশোর আর বিদ্যালয়ে আসে না বিদ্যালয়ের পাঠ গহনের জন্য। শুধু তাই নয় এই হাওরবাসীর সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসে বিভিন্ন দুর্যোগ ।এবং তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হয় প্রকৃতির আচরণে। আর এই হাওরের প্রকৃতির সৌন্দর্য্য ও হাওরপাড়ের মানুষের,জীবন যুদ্ধের বিরামহীন যুদ্ধ দেখতে আসেন,দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে প্রকৃতিপ্রেমীগন, আর তারা শুধু হাওরের প্রকৃতির সৌন্দর্য্য ও হাওরবাসীর মুখে তৃপ্তি ও স্বস্তির হাসিই দেখতে চান। কিন্তু এই অবহেলিত হাওরবাসীর নীরব আহাজারি শুনতে চায় না