মায়ানমার কে কিলো ক্লাস সাবমেরিন সরবরাহ করছে ভারত

2

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ চলতি বছরের শেষেই মিয়ানমারের কাছে নিজস্ব একটি কিলো-ক্লাস সাবমেরিন হস্তান্তরের কথা রয়েছে ভারতের। মিয়ানমারের সঙ্গে কৌশলগত ও সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় এ সাবমেরিন হস্তান্তর করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ভারত-মিয়ানমারের কৌশলগত নিরাপত্তা জোট নতুন উচ্চতায় পৌঁছার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোয় নৌবাহিনীর অস্ত্রসম্ভার রফতানি নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যকার রশি টানাটানির বিষয়টিও এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।

শীতল যুদ্ধের যুগে কিলো-ক্লাস সাবমেরিনকে বিবেচনা করা হতো ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক ও সাগরপৃষ্ঠের আতঙ্ক হিসেবে। চোরাগোপ্তা আক্রমণের সক্ষমতাকে যদি সমুদ্রপৃষ্ঠে সাবমেরিন কার্যক্রমের মূলমন্ত্র হিসেবে ধরা হয়, তাহলে এর জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত হলো কিলো-ক্লাস সাবমেরিন। প্রকৃতপক্ষেই, যে কয় ধরনের ডিজেল ইলেকট্রিক সাবমেরিন সারফেস টু এয়ার মিসাইল ছোড়ার উপযুক্ত; কিলো-ক্লাস তার অন্যতম।

যা-ই হোক, এয়ার ইনডিপেনডেন্ট প্রপালশন (এআইপি) সিস্টেম, যা সাবমেরিনের দীর্ঘ সময় নিমজ্জিত থাকা ও আরো গোপনে কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ; তা এ ধরনের সাবমেরিনে অনুপস্থিত। বিষয়টিকে এর দুর্বলতা ধরে নিয়ে বলা যায়, বঙ্গোপসাগরে গোপনে চলাচল ও আঘাত হানার ক্ষেত্রে মিং ক্লাস টাইপ ০৩৫জি সাবমেরিন, যা ২০১৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দেয়া হয়েছে—নিশ্চিতভাবেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

ভারতের মিয়ানমারকে কিলো-ক্লাস সাবমেরিন প্রদানের ঘোষণাটি লক্ষণীয় হওয়ার পেছনে কারণ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত ও সামরিক প্রভাববলয়ে এর কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সে বিষয়েও রয়েছে নানা হিসাবকিতাব।

ভারতের চোখে মিয়ানমার হলো ‘পুবে চলো’ নীতি বাস্তবায়নের সিঁড়ি। বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব মোকাবেলায় দেশটির গৃহীত আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিলান এক্সারসাইজ (২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এক নৌমহড়া) ও ইন্ডিয়ান ওশেন নেভাল সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিতে নিরাপত্তা ইস্যুকেও জুড়ে দিয়েছে ভারত। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় দেশগুলোয় চীনের সামরিক প্রভাব বৃদ্ধিকে ঠেকাতে মিয়ানমারের কাছে সাবসারফেস নেভাল আর্মামেন্ট বিক্রি করছে ভারত, যার লক্ষ্য হলো উপকূলীয় এসব দেশে চীনের অস্ত্র রফতানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। বঙ্গোপসাগরের নীল বলয়ে ভারতের প্রভাব তৈরিতে এ উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষেই সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ভারতের কাছে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু, সেটিও প্রকাশ পায় এর মধ্য দিয়ে।

২০১৬ সালে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনএস জয়যাত্রা ও বিএনএস নবযাত্রা নামে দুটি মিং ক্লাস সাবমেরিন ক্রয়ের মধ্য দিয়েই বঙ্গোপসাগরে ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন ক্রয়ের প্রতিযোগিতাটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের কাছে চীনা সাবমেরিনের মালিকানা চলে আসার পর নীরবে শক্তির ভারসাম্য আনার প্রয়াস থেকেই ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে পরিমার্জিত কিলো-ক্লাস সাবমেরিন ক্রয়ের আগ্রহ দেখিয়েছে মিয়ানমার। যা-ই হোক, এর কিছু ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। মিয়ানমারের সাবমেরিন ক্রয়ের ঘোষণার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে, ভারতও যার আওতার বাইরে নয়। বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমারের ভূকৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় ভারতের সাবমেরিন হস্তান্তরের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক ও যথার্থ বলা চলে।

কিন্তু চীন ও মিয়ানমারের মধ্যকার জটিল সামরিক ও অর্থনৈতিক যোগসূত্রগুলোকে খতিয়ে দেখলে বিষয়টির জটিলতাই ফুটে ওঠে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই চীনের সঙ্গে এক জটিল সম্পর্ক বজায় রেখেছে মিয়ানমার। কূটনৈতিক সম্পর্কে কখনো কখনো টানাপড়েন দেখা দিলেও সেখানে সামরিক ও প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বিদ্যমান। সুতরাং, বলা চলে চীনের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক দিয়ে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা মিয়ানমারের রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক ফ্যাক্টশিটে দেখা যায়,

২০১৪-২০১৮ সালের মধ্যে মিয়ানমারের প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ ছিল চীন। সুতরাং, মিয়ানমারের ওপর থেকে চীনের সামরিক প্রভাব রাতারাতি উবে যাবে, এ ধরনের প্রত্যাশা একেবারেই অমূলক। এমন মতের ক্ষেত্রেও সমর্থন পাওয়া যায়, ভারতের সাবমেরিন হস্তান্তরের সিদ্ধান্তটি বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের হাত ঘুরে নবসজ্জিত কিলো-ক্লাস সাবমেরিনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত তথ্যও চীনের কাছে চলে যেতে পারে।

সত্রঃ বণিক বার্তা